TET (CDP) || থর্নডাইকের বুদ্ধির বহু-উপাদান তত্ত্ব || PDF
আপার প্রাইমারি এবং প্রাইমারি টেটের (Upper Primary & Primary TET) প্রস্তুতির জন্য এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থর্নডাইকের বুদ্ধির বহু-উপাদান তত্ত্ব
মনোবিদ এডওয়ার্ড এল থর্নডাইক (Edward L. Thorndike) বুদ্ধির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে তত্ত্বটি প্রকাশ করেন, তা ‘বহু-উপাদান তত্ত্ব’ (Multifactor Theory) নামে পরিচিত। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Educational Psychology’ গ্রন্থে তিনি এই তত্ত্বের অবতারণা করেন। নিচে আপনার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত এবং তথ্যসমৃদ্ধ নোট দেওয়া হলো:
১. ভূমিকা ও স্পিয়ারম্যানের তত্ত্বের বিরোধিতা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মনোবিদ চার্লস স্পিয়ারম্যান বুদ্ধির ‘দ্বি-উপাদান তত্ত্ব’ (Two-Factor Theory) প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যে সব মানুষের সব ধরণের বৌদ্ধিক কাজের পেছনে একটি সাধারণ উপাদান বা ‘G’ ফ্যাক্টর (General Factor) কাজ করে।
থর্নডাইক স্পিয়ারম্যানের এই সর্বজনীন ‘G’ উপাদানের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, মানুষের মনের কোনো একটি একক শক্তি বা সাধারণ ক্ষমতা বলে কিছু নেই। বুদ্ধি কোনো একক উপাদান দিয়ে তৈরি নয়, বরং এটি বহুসংখ্যক পৃথক ক্ষমতার একটি জটিল সমষ্টি।
২. তত্ত্বের মূল বক্তব্য (Core Concept)
- স্বাধীন ও ক্ষুদ্র উপাদানের সমষ্টি: থর্নডাইকের মতে, মানুষের বুদ্ধি অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র, সুনির্দিষ্ট এবং পরস্পর স্বাধীন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি উপাদান এক একটি বিশেষ মানসিক ক্ষমতার প্রতীক।
- নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট উপাদান: যখন আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট মানসিক কাজ (যেমন: অংক করা বা কবিতা লেখা) করি, তখন সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় একগুচ্ছ ক্ষুদ্র উপাদান একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্য কোনো ভিন্ন কাজের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা উপাদান কাজ করতে পারে।
- কোনো সাধারণ শক্তির অনুপস্থিতি: এক কাজের দক্ষতা অন্য কাজের দক্ষতার গ্যারান্টি দেয় না, যদি না কাজ দুটির মধ্যে কোনো মিল থাকে।
৩. তত্ত্বের ভিন্ন নাম ও তাৎপর্য
থর্নডাইকের এই তত্ত্বটি মনস্তত্ত্বে আরও দুটি বিশেষ নামে পরিচিত:
- ক) পরমাণুবাদী তত্ত্ব (Atomistic Theory): পদার্থ যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত হয়, ঠিক তেমনি মানুষের বুদ্ধিও অসংখ্য ক্ষুদ্র মানসিক ক্ষমতার পরমাণু দিয়ে তৈরি। এই কারণে একে পরমাণুবাদী তত্ত্ব বলা হয়।
- খ) বালির ঢিবি তত্ত্ব (Anarchic or Sand-heap Theory): একটি বালির ঢিবি যেমন কোটি কোটি ক্ষুদ্র বালুকণার সমষ্টি, যেখানে প্রতিটি বালুকণা স্বাধীন কিন্তু একসঙ্গে মিলে একটি ঢিবি তৈরি করে, মানুষের বুদ্ধিও ঠিক তেমনি। কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষমতার সমষ্টিই হলো মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধি। এই উপমার কারণে সমালোচকরা একে অনেক সময় ‘বালির ঢিবি তত্ত্ব’ বলে থাকেন।
৪. বুদ্ধির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা পরিমাপের মাত্রা (Four Attributes of Intelligence)
থর্নডাইক বুদ্ধির কার্যকারিতা এবং তার পরিমাপকে বোঝার জন্য ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথা বলেছেন:
১. স্তর (Level / Altitude): কোনো একটি কাজের জটিলতার স্তর। একজন ব্যক্তি কতটা কঠিন বা জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারছেন, তা দিয়ে বুদ্ধির এই স্তর পরিমাপ করা হয়।
২. বিস্তার (Range / Breadth): কোনো একটি নির্দিষ্ট কঠিন স্তরে একজন ব্যক্তি কতগুলি ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারেন। অর্থাৎ, বুদ্ধির পরিধি কতটা বিস্তৃত।
৩. ক্ষেত্র (Area): স্তর এবং বিস্তারের গুণফলই হলো ক্ষেত্র। একজন ব্যক্তি মোট কত রকমের ও কত সংখ্যার বৌদ্ধিক কাজ করতে সক্ষম, তা এর দ্বারা বোঝা যায়।
৪. গতি (Speed): কোনো একটি বৌদ্ধিক সমস্যার সমাধান করতে একজন ব্যক্তি কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা রেসপন্স করছেন, তার পরিমাপ।
৫. বুদ্ধির প্রকারভেদ (Types of Intelligence)
এই বহু-উপাদান ধারণার ওপর ভিত্তি করে থর্নডাইক বুদ্ধিকে মূলত ৩টি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন:
- বিমূর্ত বুদ্ধি (Abstract Intelligence): শব্দ, সংখ্যা, প্রতীক বা তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা। যেমন— বিজ্ঞানী, গণিতবিদ বা সাহিত্যিকদের এই বুদ্ধি বেশি থাকে।
- মূর্ত বা যান্ত্রিক বুদ্ধি (Concrete / Mechanical Intelligence): কোনো বস্তু, যন্ত্রপাতি বা হাত-কলমের কাজ করার ক্ষমতা। যেমন— প্রকৌশলী (Engineers) বা মেকানিকদের এই বুদ্ধি প্রয়োজন হয়।
- সামাজিক বুদ্ধি (Social Intelligence): সমাজ বা পরিবেশের অন্যান্য মানুষদের বোঝার এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার ক্ষমতা। যেমন— নেতা বা সমাজকর্মীদের এই বুদ্ধি বেশি থাকে।
৬. কাজ বা বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক (Concept of Correlation)
যদি স্পিয়ারম্যানের ‘G’ উপাদান না থাকে, তবে মানুষ একই সাথে একাধিক কাজে ভালো কীভাবে হয়? এর জবাবে থর্নডাইক বলেন, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কাজের মধ্যে যদি কিছু উপাদানের ‘সাধারণ মিল’ (Common Elements) থাকে, তবেই একজন ব্যক্তি দুটি কাজেই ভালো হতে পারে। একে তিনি ‘যৌথ উপাদান’ (Overlapping Factors) বলেছেন। কাজ দুটির মধ্যে মিল যত বেশি হবে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক (Correlation) তত বেশি হবে।
৭. তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা
- এই তত্ত্বটি বুদ্ধিকে এত বেশি খণ্ড খণ্ড করে ফেলেছে যে, এতে মানুষের সামগ্রিক মানসিক সংগঠনের ঐক্য বা একাত্মতা হারিয়ে যায়।
- পরবর্তীকালে থার্স্টোন বা গিলফোর্ডের মতো মনোবিদরা প্রমাণ করেন যে বুদ্ধি একেবারে সম্পূর্ণ স্বাধীন উপাদানের সমষ্টি নয়, বরং এদের মধ্যে কিছু গোষ্ঠীগত মিল থাকে।
সংক্ষেপে: থর্নডাইকের বহু-উপাদান তত্ত্ব মূলত মানুষের বুদ্ধির বৈচিত্র্য এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষমতার ওপর জোর দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে কোনো মানুষ একটি নির্দিষ্ট কাজে দুর্বল মানেই সে সব কাজে দুর্বল নয়, কারণ তার অন্যান্য স্বাধীন উপাদানগুলো অন্য কোনো ক্ষেত্রে চমৎকার কাজ করতে পারে।
