দ্বিজ বংশীদাস || WB SLST (বাংলা 9–10 / 11–12)
WB SLST (বাংলা 9–10 / 11–12)
দ্বিজ বংশীদাস
এর কবিপ্রতিভা ও কাব্যবিচার
১. ভূমিকা
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় ধারা হলো মঙ্গলকাব্য। এই ধারার প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় শাখাটি হলো মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ। সর্পদেবী মনসার মাহাত্ম্য কীর্তন এবং মর্ত্যে তাঁর পূজা প্রচারকে কেন্দ্র করে এই কাব্যের সৃষ্টি। মনসামঙ্গলের কবিদের মধ্যে কালানুক্রমিকভাবে ও জনপ্রিয়তার বিচারে কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপলাই এবং কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে যাঁর নাম পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন দ্বিজ বংশীদাস। করুণ রস পরিবেশনে এবং চরিত্র চিত্রণে তিনি মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সীমানা ছাড়িয়ে আধুনিক মনস্তত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
২. কবির আত্মপরিচয় ও সময়কাল
দ্বিজ বংশীদাসের সঠিক সময়কাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও কাব্যের অভ্যন্তরীণ প্রমাণ থেকে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
- বাসস্থান: কবি দ্বিজ বংশীদাস বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত (তৎকালীন মোমেনশাহী বা ময়মনসিংহ জেলা) পাতুয়ায় বা পাটুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এই গ্রামটি ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।
- পারিবারিক পরিচয়: বংশীদাসের পিতার নাম ছিল যাদবানন্দ এবং মাতার নাম অঞ্জনা। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাই নামের আগে ‘দ্বিজ’ উপাধি ব্যবহার করতেন। তাঁর সহধর্মিণীর নাম ছিল সুলোচনা।
- চন্দ্রাবতীর পিতা: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিজ বংশীদাসের আর একটি মস্ত বড় পরিচয় হলো, তিনি বাংলার প্রথম মহিলা কবি এবং রামায়ণের রচয়িতা চন্দ্রাবতী-র পিতা। চন্দ্রাবতীর ট্রাজিক জীবনকথা এবং তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিতে পিতা বংশীদাসের গভীর প্রভাব ছিল।
- সময়কাল নির্ণয়: ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন এবং আচার্য সুকুমার সেনের মতে, দ্বিজ বংশীদাস খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর (১৬ শতক) মধ্যভাগের কবি। ধারণা করা হয়, ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দের আশেপাশে তিনি তাঁর ‘পদ্মাপুরাণ’ বা মনসামঙ্গল কাব্যটি রচনা সমাপ্ত করেন। অর্থাৎ, তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক ছিলেন।
৩. দ্বিজ বংশীদাসের কাব্যের নামকরণ ও প্রসার
দ্বিজ বংশীদাস তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যটিকে ‘পদ্মাপুরাণ’ নামে অভিহিত করেছেন। পূর্ববঙ্গে (বিশেষত ময়মনসিংহ, সিলেট, ত্রিপুরা ও ঢাকা অঞ্চলে) এই কাব্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আজও পূর্ববঙ্গের বহু গ্রামীণ জনপদে মনসা পূজার সময় বা শ্রাবণ মাসে বংশীদাসের পদ্মাপুরাণ সুর করে গাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তাঁর কাব্যের ভাষা সহজ-সরল হলেও তাতে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার (আঞ্চলিক শব্দ) একটি সুন্দর প্রলেপ লক্ষ্য করা যায়।
৪. দ্বিজ বংশীদাসের কাব্যের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
দ্বিজ বংশীদাসের কবিপ্রতিভা মনসামঙ্গলের অন্যান্য কবিদের থেকে তাঁকে এক স্বতন্ত্র আসনে বসিয়েছে। তাঁর কাব্যের প্রধান প্রধান সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
(ক) করুণ রসের সার্থক পরিবেশন
মনসামঙ্গল কাব্যের মূল পরিণতিই হলো ট্র্যাজেডি বা করুণ রস। লখিন্দরের মৃত্যু এবং বেহুলার বৈধব্য-যন্ত্রণা এই কাব্যের প্রাণ। দ্বিজ বংশীদাস করুণ রস সৃষ্টিতে অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। সর্পদংশনের পর লখিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে যখন বেহুলা ভেলায় ভেসে যাচ্ছে, সেই দৃশ্য এবং বেহুলার বিলাপ বর্ণনায় কবি পাঠকের চোখে জল এনে দেন। বাৎসল্য রস ও করুণ রসের এমন মেলবন্ধন মধ্যযুগের খুব কম কবির কাব্যে দেখা যায়।
(খ) বাস্তব সমাজচিত্রের নিখুঁত অঙ্কন
মঙ্গলকাব্যগুলি দেবমাহাত্ম্য জ্ঞাপক হলেও, আসলে তা তৎকালীন বাঙালি সমাজেরই দর্পণ। বংশীদাসের কাব্যে ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ববঙ্গের সমাজ-জীবন, জাতিভেদ প্রথা, আহার-বিহার, বিবাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠান, এবং নারীর অলঙ্কার ও পোশাক-আশাকের অতি নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ধনপতি বা চাঁদ সদাগরের বাণিজ্য যাত্রার বিবরণে তৎকালীন নৌবাণিজ্য ও নদীপথের যে ভৌগোলিক চিত্র তিনি দিয়েছেন, তা ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান।
(গ) মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র চিত্রণ
বংশীদাসের কাব্যের চরিত্রগুলি কেবল দেব-তাড়িত পুতুল নয়, তারা রক্তমাংসের মানুষ।
- চাঁদ সদাগর: বংশীদাসের কাব্যে চাঁদ সদাগরের অহংকার, শিবভক্তি এবং চরম দুর্গতির দিনেও মনসার কাছে মাথা নত না করার যে জেদ—তা এক মহাকাব্যিক ট্রাজিক নায়কের রূপ নিয়েছে।
- বেহুলা: সতীত্বের আদর্শে উজ্জ্বল হলেও বংশীদাসের বেহুলা অনেক বেশি মানবিক। সে যেমন ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তেমনই স্বামীর জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য দেবতাদের দরবারে নিজের আত্মমর্যাদা বিসর্জন না দিয়ে সগর্বে নৃত্য প্রদর্শন করতে পারে।
- মনসা: বংশীদাসের মনসা চরিত্রটি কিছুটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হলেও কবি তাঁর মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ও মর্ত্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আকুলতাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
(ঘ) সঙ্গীতময়তা ও পয়ার-ত্রিপদীর ব্যবহার
দ্বিজ বংশীদাস নিজে একজন ভালো গায়ক বা কথক ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। তাঁর কাব্যের ছন্দ অত্যন্ত সাবলীল। পয়ার এবং ত্রিপদী ছন্দের ব্যবহারে তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। এছাড়া কাব্যের বিভিন্ন অংশে তিনি রাগ-রাগিণীর (যেমন: ধানশী, কেদার, মল্লার ইত্যাদি) উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ করে কাব্যটি কেবল পাঠের জন্য নয়, আসরে গাওয়ার জন্যই রচিত হয়েছিল।
৫. বিজয়গুপ্ত ও কেতকাদাসের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা
WB SLST পরীক্ষায় অনেক সময় অন্য কবিদের সাথে তুলনা জানতে চাওয়া হয়। মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ দুই কবি পশ্চিমবঙ্গের কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ এবং পূর্ববঙ্গের বিজয়গুপ্তের সাথে বংশীদাসের তুলনা করলে তাঁর স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়:
- বিজয়গুপ্ত বনাম বংশীদাস: বিজয়গুপ্তের কাব্যে হাস্যরস এবং কিছুটা স্থূল কৌতুক রসের আধিক্য আছে। দেবীর হিংস্র রূপ সেখানে প্রকট। কিন্তু বংশীদাসের কাব্য অনেক বেশি মার্জিত, গম্ভীর এবং করুণ রসে সিক্ত। বিজয়গুপ্তের মনসা যতখানি কুচক্রী, বংশীদাসের মনসা তার চেয়ে অনেক বেশি গাম্ভীর্যপূর্ণ।
- কেতকাদাস বনাম বংশীদাস: কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের কাব্য সংক্ষিপ্ত এবং নাটকীয় গুণসম্পন্ন। অন্যদিকে দ্বিজ বংশীদাসের কাব্য বিশাল পরিধির এবং পুরাণের আধিক্যে ভরপুর। কেতকাদাসের ভাষা পশ্চিমবঙ্গের মার্জিত ভাষা, আর বংশীদাসের ভাষায় পূর্ববঙ্গের মাটির গন্ধ ও আঞ্চলিক শব্দের ঐশ্বর্য রয়েছে।
৬. কবি হিসেবে দ্বিজ বংশীদাসের সীমাবদ্ধতা
কোনো সাহিত্যিকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। বংশীদাসের কাব্যেও কিছু ত্রুটি সমালোচকদের চোখে পড়েছে:
- অতিরিক্ত দীর্ঘতা: কবি তাঁর কাব্যকে ‘পুরাণ’ নাম দেওয়ায়, এতে অপ্রাসঙ্গিক বহু পৌরাণিক কাহিনীর অবতারণা করেছেন (যেমন: শিবের জন্ম, দক্ষযজ্ঞ ইত্যাদি)। এর ফলে মূল কাহিনী অর্থাৎ চাঁদ-বেহুলার আখ্যান অনেক জায়গায় মন্থর হয়ে পড়েছে।
- আঞ্চলিকতার প্রভাব: পূর্ববঙ্গের বাইরের পাঠকদের কাছে তাঁর কাব্যের কিছু কিছু আঞ্চলিক শব্দ ও রূপতাত্ত্বিক গঠন কিছুটা দুরূহ মনে হতে পারে।
- অলৌকিকতার আধিক্য: বাস্তব সমাজচিত্র আঁকলেও অনেক জায়গায় অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার ওপর কবি অতিরিক্ত নির্ভর করেছেন, যা কাহিনীর স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করেছে।
৭. মূল্যায়ন ও উপসংহার
উপরে উল্লেখিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দ্বিজ বংশীদাস মনসামঙ্গল কাব্য ধারায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কাব্যের কাব্যমূল্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি মধ্যযুগীয় ভক্তিবাদী কাঠামোর মধ্যে থেকেও মানুষের সুখ-দুঃখ, কান্না ও সংগ্রামকে যেভাবে মান মর্যাদা দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কন্যা চন্দ্রাবতীর সাহিত্যিক প্রেরণা হিসেবেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সংক্ষেপে বলা যায়, লখিন্দরের ট্র্যাজেডিকে বাঙালি হৃদয়ের চিরন্তন শোকে পরিণত করার ক্ষেত্রে দ্বিজ বংশীদাসের ‘পদ্মাপুরাণ’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাই WB SLST পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যযুগের কবিদের তালিকায় দ্বিজ বংশীদাসের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শীর্ষস্থানীয়।
পরীক্ষার জন্য টিপস: এই নোটটি লেখার সময় কবির সময়কাল (১৬ শতক), বাসস্থান (পাতুয়া গ্রাম, কিশোরগঞ্জ), তাঁর কন্যা চন্দ্রাবতীর উল্লেখ এবং কাব্যের নাম ‘পদ্মাপুরাণ’—এই তথ্যগুলি অবশ্যই হাইলাইট করবেন। তুলনামূলক আলোচনা অংশটি উত্তরের মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।
