WB UPPER PRIMARY TET || History (ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন ) || Social Studies PDF

0
HistoryUPTET21

WB UPPER PRIMARY TET || History (ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন ) || Social Studies

ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন 

ভারতে ঔপনিবেশিকতা ও তার প্রভাব নিয়ে  (WB TET) এর সামাজিক বিজ্ঞান (ইতিহাস) পাঠ্যক্রমের একটি বিস্তারিত, তথ্যভিত্তিক এবং পয়েন্ট-ভিত্তিক আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।(পর্তুগিজ আগমণ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি, দিনেমার, ব্রিতিষ সাম্রাজ্য বিস্তার, কোম্পানির শাসন , দেওয়ানি লাভ, গভর্নর জেনেরেল, বিচার ব্যবস্থা, বিভিন্ন বিদ্রোহ – চূয়াড় বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুণ্ডা বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ, )  

১. ভারতে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন (পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি, দিনেমার)

পঞ্চদশ শতকে কনস্টান্টিনোপলের পতনের (১৪৫৩ খ্রি.) পর স্থলপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে ইউরোপীয় শক্তিগুলি ভারতের সাথে বাণিজ্যের জন্য জলপথ আবিষ্কারে ব্রতী হয়। এর ফলে ভারতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ঘটে।

(ক) পর্তুগিজ আগমন

  • জলপথ আবিষ্কার: ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ প্রদক্ষিণ করে ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছান। কালিকটের তৎকালীন হিন্দু রাজা জামোরিন তাঁকে স্বাগত জানান।
  • প্রথম উপনিবেশ: ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা ভারতের কোচিনে তাদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে।
  • গুরুত্বপূর্ণ গভর্নরগণ:
    • ফ্রান্সিসকো ডি আলমেদিয়া (১৫০৫-১৫০৯): তিনি ভারতে প্রথম পর্তুগিজ গভর্নর ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত নীতি ছিল “নীল জল নীতি” (Blue Water Policy), যার উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ নৌ-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
    • অ্যালফনসো ডি আলবুকার্ক (১৫০৯-১৫১৫): তাঁকে ভারতে পর্তুগিজ শক্তির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে বিজাপুরের সুলতানের কাছ থেকে গোয়া দখল করেন।
  • পর্তুগিজদের প্রভাব ও পতন: পর্তুগিজরা ভারতে আলকাতরা, তামাক চাষ এবং মুদ্রণ যন্ত্র (Printing Press – ১৫৫৬ খ্রি.) প্রবর্তন করে। কিন্তু তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জলদস্যুতা এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজদের প্রতিযোগিতার কারণে তাদের পতন ঘটে।

(খ) ওলন্দাজ (ডাচ) আগমন

  • কোম্পানি গঠন: নেদারল্যান্ডসের বণিকরা ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ‘ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অফ নেদারল্যান্ডস’ গঠন করে ভারতে আসে।
  • বাণিজ্য কুঠি: ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে অন্ধ্রপ্রদেশের মসুলিপত্তনমে তারা প্রথম কুঠি স্থাপন করে। বাংলায় তাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল চুঁচুড়া (১৬৫৩ খ্রি.)। এছাড়া পুলিকট, নাগাপত্তনম এবং সুরাটেও তাদের কুঠি ছিল।
  • পতন: ওলন্দাজরা মূলত মসলা বাণিজ্যের জন্য ইন্দোনেশিয়ার দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের সাথে বেদারার যুদ্ধে ওলন্দাজরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং ভারত থেকে তাদের আধিপত্য বিলুপ্ত হয়।

(গ) ইংরেজ আগমন

  • কোম্পানি প্রতিষ্ঠা: ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে একদল ইংরেজ বণিক ‘মার্চেন্ট অ্যাডভেঞ্চারার্স’ নামে একটি দল গঠন করে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর রানী এলিজাবেথ (প্রথম) এই কোম্পানিকে পূর্বে বাণিজ্যের জন্য ১৫ বছরের একচেটিয়া অধিকার বা চার্টার প্রদান করেন। এটিই ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
  • প্রথম আগমন: ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রথম জেমসের দূত হয়ে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন এবং সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি চান।
  • কুঠি স্থাপন: ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে মসুলিপত্তনমে এবং ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে সুরাটে ইংরেজদের প্রথম স্থায়ী বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সিস ডে মাদ্রাজ (চেন্নাই) শহর প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে ‘ফোর্ট সেন্ট জর্জ’ দুর্গ নির্মিত হয়।
  • বাংলায় বিস্তার: ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে গ্যাব্রিয়েল বাটন-এর সহায়তায় ইংরেজরা হুগলিতে কুঠি স্থাপন করে। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে জব চার্নক সুতানুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর—এই তিনটি গ্রাম নিয়ে কলকাতা নগরীর পত্তন করেন। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে এখানে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মিত হয়।

(ঘ) দিনেমার (ড্যানিশ) আগম

  • কোম্পানি গঠন: ডেনমার্কের বণিকরা ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে।
  • উপনিবেশ: ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে তামিলনাড়ুর ত্রাঙ্কুবার এবং ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার শ্রীরামপুরে তারা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। শ্রীরামপুর ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
  • বিদায়: বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিনেমাররা তাদের সমস্ত সম্পত্তি ব্রিটিশদের কাছে বিক্রি করে ভারত ত্যাগ করে।

(ঙ) ফরাসি আগমন

  • কোম্পানি গঠন: ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের মন্ত্রী কোলবার্ট-এর উদ্যোগে ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (Compagnie des Indes Orientales) গঠিত হয়।
  • বাণিজ্য কেন্দ্র: ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঁসোয়া ক্যারন সুরাটে প্রথম ফরাসি কুঠি স্থাপন করেন। ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে মসুলিপত্তনম এবং ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিচেরি (প্রধান কেন্দ্র) স্থাপিত হয়। বাংলায় ফরাসিদের প্রধান ঘাঁটি ছিল চন্দননগর (১৬৭৩ খ্রি.)।
  • কর্ণাটকের যুদ্ধ ও পতন: ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই ‘কর্ণাটকের যুদ্ধ’ (১৭৪৬-১৭৬৩ খ্রি.) নামে পরিচিত। ফরাসি গভর্নর ডুপ্লে অত্যন্ত দূরদর্শী হলেও ফরাসি সরকারের অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বন্দিবাসের যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি আইয়ার কুটের কাছে ফরাসিরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলে ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

২. ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার ও কোম্পানির শাসন

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্যবিধাতায় পরিণত হয়। এই রূপান্তর ঘটেছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও কূটনীতির মাধ্যমে।

(ক) পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭ খ্রি.)

  • প্রেক্ষাপট: বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজদের বাণিজ্যিক বিরোধ, দস্তকের (বাণিজ্যিক ছাড়পত্র) অপব্যবহার এবং কলকাতার দুর্গ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে পৌঁছায়।
  • যুদ্ধ: ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন নদীয়া জেলার পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধ হয়।
  • ফলাফল: মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাব পরাজিত ও নিহত হন। এই যুদ্ধের ফলে বাংলায় ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক পার্সিভাল স্পিয়ারের মতে, এর মাধ্যমে “পলাশীর লুণ্ঠন” শুরু হয়।

(খ) বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪ খ্রি.)

  • প্রেক্ষাপট: মীর জাফরের পর ইংরেজরা মীর কাশিমকে বাংলার নবাব করে। মীর কাশিম স্বাধীনচেতা হওয়ায় ইংরেজদের দস্তকের অপব্যবহার রোধ করার চেষ্টা করেন এবং রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন।
  • যুদ্ধ: ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর মীর কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে ইংরেজ সেনাপতি মেজর হেক্টর মুনরো-র যুদ্ধ হয়।
  • ফলাফল: সম্মিলিত বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর যুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে আইনি ও বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।

৩. দেওয়ানি লাভ ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব

(ক) দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫ খ্রি.)

  • চুক্তি: বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট লর্ড ক্লাইভ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে ‘এলাহাবাদের প্রথম চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন।
  • অধিকার: এই চুক্তির মাধ্যমে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের আইনি অধিকার) লাভ করে।

(খ) দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (১৭৬৫-১৭৭২ খ্রি.)

  • ধারণা: দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলায় এক অভিনব শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা ‘দ্বৈত শাসন’ নামে পরিচিত।
  • বিভাগ: এর ফলে বাংলায় দুটি শাসনকেন্দ্র তৈরি হয়:
    1. কোম্পানির হাতে: দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব (ক্ষমতাহীন দায়িত্ব)।
    2. নবাবের হাতে: নিজামত বা অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব (দায়িত্বহীন ক্ষমতা)।
  • প্রভাব ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ / ১৭৭০ খ্রি.): কোম্পানির চরম শোষণ, অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় এবং খরা-র ফলে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস এসে এই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান।

৪. গুরুত্বপূর্ণ গভর্নর জেনারেল ও তাঁদের নীতি

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ পাস করে বাংলার গভর্নর পদটিকে ‘গভর্নর জেনারেল’-এ উন্নীত করে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ গভর্নর জেনারেলদের কার্যাবলী দেওয়া হলো:

গভর্নর জেনারেলসময়কালগুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী ও নীতি
ওয়ারেন হেস্টিংস১৭৭২-১৭৮৫দ্বৈত শাসনের অবসান (১৭৭২), পাঁচশালা ও একশালা বন্দোবস্ত, সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা (১৭৭৪), এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা (১৭৮৪)।
লর্ড কর্নওয়ালিস১৭৮৬-১৭৯৩চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩), কর্নওয়ালিস কোড (Cornwallis Code) প্রবর্তন, ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের (ICS) জনক।
লর্ড ওয়েলেসলি১৭৯৮-১৮০৫অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) প্রবর্তন। প্রথম গ্রহণ করে হায়দরাবাদের নিজাম (১৭৯৮)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮০০)।
লর্ড হেস্টিংস১৮১৩-১৮২৩ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধ এবং সুগৌলির চুক্তি (১৮১৬), মারাঠা শক্তির চূড়ান্ত দমন, ‘পিণ্ডারি’ দস্যুদের দমন।
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক১৮২৮-১৮৩৫সতীদাহ প্রথা রদ (১৮২৯-এর XVII রেগুলেশন), ঠগী দস্যু দমন, মেকলে মিনিটের ভিত্তিতে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন (১৮৩৫)। ভারতের প্রথম অফিসিয়াল গভর্নর জেনারেল।
লর্ড ডালহৌসি১৮৪৮-১৮৫৬স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) প্রবর্তন (প্রথম গ্রাস করেন সাতারা, ১৮৪৮), ভারতে প্রথম রেলপথ স্থাপন (১৮৫৩), বোম্বে থেকে থানে, বিধবা বিবাহ আইন পাস (১৮৫৬)।

৫. ঔপনিবেশিক বিচার ব্যবস্থা

ব্রিটিশরা ভারতে পা রাখার আগে এদেশীয় বিচার ব্যবস্থা মূলত ধর্মীয় আইন (হিন্দু শাস্ত্র ও শরিয়ত) অনুযায়ী পরিচালিত হতো। ব্রিটিশরা এসে একটি আধুনিক ও লিখিত আইনি কাঠামো তৈরি করে।

  • মেয়রস কোর্ট (১৭২৬): মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতায় প্রথম ব্রিটিশ ধাঁচের বিচারালয় স্থাপিত হয়।
  • সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা (১৭৭৪): ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৭cell৪ সালে কলকাতায় একটি সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্যার এলিজা ইম্পে
  • কর্নওয়ালিস কোড (১৭৯৩): লর্ড কর্নওয়ালিস বিচার বিভাগকে রাজস্ব বিভাগ থেকে পৃথক করেন। তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের একটি সুনির্দিষ্ট স্তরবিন্যাস তৈরি করেন।
  • ল আইনের সংকলন (Law Commission): ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের চার্টার অ্যাক্ট অনুযায়ী লর্ড মেকলের নেতৃত্বে প্রথম ‘ল কমিশন’ গঠিত হয়। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ইন্ডিয়ান পেনাল কোড (IPC – ১৮৬০) এবং ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) রচিত হয়।
  • হাইকোর্ট অ্যাক্ট (১৮৬১): এই আইন অনুযায়ী কলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজে পুরোনো সুপ্রিম কোর্ট বিলুপ্ত করে আধুনিক হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয় (১৮৬২ খ্রি.)।

৬. ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উপজাতি ও কৃষক বিদ্রোহ

ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ, জঙ্গল ও জমির ওপর অধিকার হরণ এবং মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ দেখা দেয়। WB TET পরীক্ষার জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(ক) সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০ খ্রি.)

  • অঞ্চল: ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গ।
  • কারণ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণ, তীর্থযাত্রার ওপর কর আরোপ এবং কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ।
  • নেতৃত্ব: ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, মজনু শাহ, মুসা শাহ এবং চিরাগ আলী।
  • বিশেষ তথ্য: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ এবং ‘দেবী চৌধুরানী’ এই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত।

(খ) চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৬-১৮১৬ খ্রি.)

  • অঞ্চল: মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও জঙ্গলমহল এলাকা। ‘চুয়াড়’ শব্দটি মূলত অবজ্ঞাসূচক, এরা ছিলেন স্থানীয় আদিবাসী পাইক বা রক্ষী বাহিনী।
  • কারণ: ব্রিটিশদের নতুন ভূমিরাজস্ব নীতি, পাইকান জমির ওপর কর আরোপ এবং বহিরাগতদের প্রবেশ।
  • নেতৃত্ব: প্রথম পর্বের নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ সিং (১৭৬৯)। দ্বিতীয় পর্বের (১৭৯৮-৯৯) বিখ্যাত নেত্রী ছিলেন মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানী শিরোমণি (তাঁকে ‘মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ’ বলা হয়) এবং দুর্জন সিং।

(গ) কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩২ খ্রি.)

  • অঞ্চল: ছোটনাগপুর, রাঁচি, সিংহভূম, হাজারীবাগ ও মানভূম অঞ্চল।
  • কারণ: কোলদের নিজস্ব জমিতে ব্রিটিশদের কর আরোপ, বহিরাগত মহাজন ও জমিদারদের (যাদের কোলরা ‘দিকু’ বলত) অত্যাচার এবং আফিম চাষে বাধ্য করা।
  • নেতৃত্ব: বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগত, ঝিন্দরাই মানকি এবং সুই মুণ্ডা।
  • ফলাফল: ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহ দমনের পর আদিবাসীদের সুরক্ষায় ‘দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি’ (South-West Frontier Agency – SWFA) গঠন করে।

(ঘ) সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৬ খ্রি.)

  • অঞ্চল: রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশীয় অঞ্চল, যা ‘দামিন-ই-কোহ্’ (অর্থ: পাহাড়ের প্রান্তদেশ) নামে পরিচিত ছিল। বর্তমান বিহার ও ঝাড়খণ্ডের ভাগলপুর ও বীরভূম জেলা।
  • কারণ: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সাঁওতালদের জমি হাতছাড়া হওয়া, মহাজনদের উচ্চ সুদের ফাঁদ, রেললাইন তৈরির কাজে সাঁওতাল শ্রমিকদের ওপর পাশবিক অত্যাচার।
  • নেতৃত্ব: চার ভাই—সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। এছাড়া দুই বোন ফুলো ও ঝানো।
  • সূচনা: ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভগনীডিহির মাঠে প্রায় ১০,০০০ সাঁওতাল সমবেত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দেন (এই দিনটি ‘সাঁওতাল হুল দিবস’ হিসেবে পালিত হয়)।
  • ফলাফল: ব্রিটিশ বাহিনী অত্যন্ত নৃশংসভাবে বিদ্রোহ দমন করে। তবে এর ফলে সরকার ‘সাঁওতাল পরগনা’ নামে একটি পৃথক অ-নিয়ন্ত্রিত জেলা গঠন করতে বাধ্য হয়।

(ঙ) মুণ্ডা বিদ্রোহ / উলগুলান (১৮৯৯-১৯০০ খ্রি.)

  • অঞ্চল: ছোটনাগপুর অঞ্চল (বিশেষত রাঁচি ও খুঁটি জেলা)।
  • কারণ: মুণ্ডাদের ঐতিহ্যবাহী যৌথ ভূমিকর্ষণের প্রথা ‘খুঁতকাঠি প্রথা’-র বিলুপ্তি ঘটিয়ে ব্রিটিশরা ব্যক্তিগত মালিকানা ও জমিদারি প্রথা চালু করে। এছাড়া মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ নীতি এর অন্যতম কারণ ছিল।
  • নামকরণ: এই বিদ্রোহকে ‘উলগুলান’ বলা হয়, যার অর্থ ‘ভয়াবহ বিক্ষোভ’ বা ‘মহা তোলপাড়’।
  • নেতৃত্ব: বিরসা মুণ্ডা। তিনি নিজেকে ভগবানের দূত বা ‘ধরতি আবা’ (পৃথিবীর পিতা) বলে ঘোষণা করেন।
  • অবসান: ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুন রাঁচি জেলে বিরসা মুণ্ডার রহস্যজনক মৃত্যু (কলেরা বলা হলেও বিষপ্রয়োগের সন্দেহ করা হয়) হলে বিদ্রোহ স্তিমিত হয়। ১৯০৮ সালে সরকার ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন’ (Chotanagpur Tenancy Act) পাস করে খুঁতকাঠি প্রথা আংশিক ফিরিয়ে দেয়।

                        বিশেষ তথ্যভাণ্ডার (Quick One-Liners)

  1. পর্তুগিজদের প্রধান সদর দপ্তর: প্রথমে কোচিন ছিল, পরে ১৫৩০ সালে গোয়াতে স্থানান্তরিত হয়।
  2. আর্মাডা কি?: স্প্যানিশ ও পর্তুগিজদের শক্তিশালী নৌবাহিনী।
  3. দস্তক কী?: ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী ব্রিটিশ কোম্পানিকে দেওয়া শুল্কহীন বাণিজ্যের ছাড়পত্র।
  4. অন্ধকূপ হত্যা (Black Hole Tragedy): ১৭৫৬ সালের ২০ জুন সিরাজউদ্দৌলা কর্তৃক ১৪৬ জন ইংরেজকে একটি ছোট ঘরে বন্দি করার ঘটনা (বর্ণনাকারী: হলওয়েল)। এটি কলকাতার নাম বদলে ‘আলিনগর’ রাখার পর ঘটেছিল।
  5. সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law): চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি শর্ত, যেখানে নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে জমিদারদের রাজস্ব জমা দিতে হতো, অন্যথায় জমিদারি বাজেয়াপ্ত হতো।
  6. কাহন ও শিকা কী?: উপজাতি বিদ্রোহের সময় আদিবাসীদের যোগাযোগের গোপন প্রতীক বা সংকেত (যেমন সাঁওতালরা শালের ডাল ব্যবহার করত)।
  7. তিলকা মাঝি: সাঁওতাল বিদ্রোহের পূর্বসূরি আদিবাসী নেতা, যিনি ১৭৮৪-৮৫ সালে ভাগলপুরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেন এবং ফাঁসি পান।       

                                       ……………………………………

    গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে SAQ আকারে দেখে নাও। 

সম্পূর্ণ PDF টি ডাউনলোড করে নাও 👇

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *